বর্তমানে দেশে প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী রয়েছেন। তাদের একটা বড় অংশই তরুণ। যারা ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে তথ্য আদান-প্রদান ছাড়াও বিভিন্ন বিনোদন ও নিউজ প্লাটফর্মের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করছে। তথ্যের এমন অবাধ বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে গুজব, কুতথ্য ও কুটতথ্য। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই সামাজিকভাবে হেয় হচ্ছেন।
আগামী ২০২৪ সালের শুরুর দিকে দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। গত সপ্তাহেই এমনই এক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে উত্তাল হয়ে ওঠে রাজধানী ঢাকা। দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপির নেতাকর্মীরা গত ৭ ডিসেম্বর নয়াপল্টনে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন। এসময় পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়।
ওই সংঘর্ষের সময় আর্জেন্টিনার জার্সি পরা এক ব্যক্তিকে শটগান হাতে দেখা যায়। প্রাথমিকভাবে তার পরিচয় জানা না গেলেও ছবির ব্যক্তি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিষয়ক সম্পাদক আল আমিন বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। পরে চ্যানেল 24-র অনুসন্ধানে জানা যায়, সোশ্যাল মিডিয়ায় আর্জেন্টিনার জার্সি পরিহিত ব্যক্তি আসলে আনসারের একজন সদস্য। তার নাম মাহিদুর রহমান।
তার বিরুদ্ধে কুতথ্য ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে আল আমিন বলেন, ‘ আমাকে ঘিরে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। ঘটনার সময় আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম। আমি ওই ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবে জড়িত নই। সংঘর্ষের সময় আমি পল্টন এলাকায় ছিলাম না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ব্যক্তির সঙ্গে আমার শারীরিক গঠন থেকে শুরু করে চেহারায় কোনো মিল নেই।’
সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানুষজন সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে কুতথ্যের শিকার হচ্ছেন। তাই এ বিষয়টি জানতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব) পরিচালিত ফ্যাক্টওয়াচ টিমের সঙ্গে আলাপ করি। ফ্যাক্টওয়াচের ফ্যাক্ট-চেকার ও গবেষণা সহকারী শুভাশীষ দীপ বলেন, ‘কোনো একটি ভুয়া তথ্য চিহ্নিত করার প্রথম এবং গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হচ্ছে সন্দেহ করা। কোনো একটি তথ্য সামনে আসলে সেটাকে প্রশ্ন করতে হবে। এখন এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য বিভিন্ন টুলসের সাহায্য নেয়া যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো একটি ছবি আপনার সামনে আসলে আপনি সেটিকে রিভার্স ইমেজ সার্চ করে দেখতে পারেন বা কোনো ভিডিওকে আপনি ইনভিড দিয়ে যাচাই করতে পারেন।’
তিনি বলেন, ‘অপতথ্য ছড়ানো বন্ধ করতে সবার আগে যে বিষয়টি দরকার সেটি হচ্ছে সচেতনতা। যত বড় পরিসরে মানুষকে এ ব্যাপারে সচেতন করা যাবে তত ভালোভাবে অপতথ্যের বিস্তার কমানো যাবে। এর প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে ফ্যাক্ট-চেকিং। উন্নত বিশ্বের মত দেশের মূলধারার গণমাধ্যমকে ফ্যাক্ট-চেকিং এ আগ্রহ দেখাতে হবে। আলাদাভাবে এক দুইটি প্রতিষ্ঠানের ফ্যাক্ট-চেকিং এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে সচেতন করার জন্য যথেষ্ট নয়।’
তবে সবাই যে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই গুজব, কুতথ্য ও কুটতথ্যের শিকার হন বিষয়টি এমন না। একসময় সিনেমায় শিশুশিল্পী হিসেবে জনপ্রিয়তা পাওয়া অভিনেত্রী প্রার্থনা ফারদিন দীঘি গত ১১ ডিসেম্বর নিজের ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। ওই পোস্টকে ঘিরে কুতথ্যের শিকার হয়েছেন ‘পোড়ামন-২’ সিনেমার পরিচালক রায়হান রাফি। মূলধারার সংবাদমাধ্যমে এমন কুতথ্যের শিকার হয়ে অবাক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন ঢাকাই সিনেমার এই পরিচালক।
পোড়ামন-২ সিনেমার পরিচালক রায়হান রাফি
এ বিষয়ে রায়হান রাফি বলেন, ‘আমার নাম জড়ালে হয়তো আলোচনায় আসা যায় বা নিউজের ভিউ বাড়ে। তা না হলে কেন আমাকে জড়িয়ে ভিত্তিহীন সংবাদ করা হবে। তিনি বলেন, দীঘি কোথাও আমার নাম বলেনি, অভিযোগও করেনি। তারপরও দেখছি কিছু সংবাদমাধ্যম তার (দীঘি) সঙ্গে আমার নাম জড়িয়ে সংবাদ করছে। আমার নাম জড়ালে হয়তো আলোচনায় আসা যায়, তাই জড়ানো হয়। নাকি অন্য কোনো কারণে আমার নাম জড়িয়ে সংবাদ করা হয় তা বুঝতে পারি না।’
কুতথ্য ঠেকাতে মূলধারার সংবাদমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু মূলধারার সংবাদমাধ্যমই যদি গুজব, কুতথ্য, কুটতথ্য ছড়ায় সেক্ষেত্রে তা ঠেকাতে একজন সাংবাদিক কী ভূমিকা পালন করতে পারে তা জানতে চেয়েছিলাম ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের ডিজিটাল মিডিয়া বিভাগের ডেপুটি নিউজ এডিটর তায়েব মিল্লাত হোসেনের কাছে। তিনি বলেন, ‘তথ্যের ভিত্তি হচ্ছে সূত্র। তাই কোনো তথ্য যখন খবরে উপস্থাপিত হয়, তার সূত্র কী সেটা আগে দেখতে হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- সূত্রও তো অসত্য হতে পারে। এক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য প্রথমেই সন্দেহ নিয়ে দেখতে হবে। সেখানে যেসব সূত্র দেয়া থাকবে, সেগুলো যাচাই করতে হবে। এর বাইরে তথ্যগুলো মূলধারার গণমাধ্যমে কীভাবে উপস্থাপন করেছে, সেটাও দেখা যেতে পারে।’
ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের ডিজিটাল মিডিয়া বিভাগের ডেপুটি নিউজ এডিটর তায়েব মিল্লাত হোসেন
‘এখানে একটি বিষয় বলতে হয়, স্পর্শকাতর বিষয় মূলধারার গণমাধ্যম সতর্কতার সঙ্গে উপস্থাপন করে থাকে। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য সংশোধনের বিষয়টিও সেভাবে নেই। কিন্তু মূলধারার গণমাধ্যমে কোনো তথ্য ভুল হলে, তা স্বীকার করে নিয়ে সঠিক তথ্য তুলে ধরার চর্চাও আছে। এই ধারা অনুসরণ করার চেষ্টা করি আমি নিজেও।’
তিনি আরও বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগামাধ্যমে সবার সমান অধিকার থাকায় গুজবে, হুজুগে মেতে ওঠার বিষয়টিও সহজ হয়ে পড়েছে। এই প্রবণতা প্রতিরোধে ফ্যাক্ট চেকিং সাইট বা অ্যাপও আজকাল প্রয়োজনীয় অনলাইন পাটাতনে পরিণত হচ্ছে। এটা ভালো দিক। কিন্তু আমাদের দেশে এ ধরনের সাইট বা অ্যাপ জনসাধারণের কাছে এখনো সেভাবে পৌঁছেনি। ফ্যাক্ট চেকারের সহজ ব্যবহার যেমন জরুরি। তেমনি এর গুরুত্বও সবার কাছে তুলে ধরতে হবে। আর এভাবেই সত্য তথ্য নিশ্চিত করার কাজটি গতিশীল হবে।’