চলছে বর্ষা মৌসুম। এ সময় যেমন খাল-বিল, নদ-নদী ও হাওর-বাওড়ে পানি বৃদ্ধি পায়, একইভাবে এসব অঞ্চলে পর্যটকও বাড়ে। পানির গতি-প্রকৃতি না বোঝার কারণে স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যু ঝুঁকি থাকে সেসব পর্যটক অঞ্চলে। বর্তমানে সাগর, নদী, খাল, হ্রদ কিংবা পাহাড়ি ঝর্ণাঞ্চলে ভ্রমণ করতে গিয়ে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়।
সাঁতার জেনেও সাঁতার কাটতে গিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। অথচ সচেতনতা ও প্রস্তুতির মাধ্যমে এই বিপদ অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব। সাঁতার না জানলেও এই হার ৭০-৮০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব। এ ব্যাপারে চ্যানেল 24-এর সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ ওপেন ওয়াটার সুইমিংয়ের (বিওডব্লিউএস) প্রেসিডেন্ট, সুইমার ও ট্রাভেলার নাসির আহমেদ।
পানিতে প্রাণহানির ৩টি প্রধান কারণ ও তা থেকে বাঁচার উপায়:
সাঁতার না জানা:
অনেকেই সাঁতার না জেনেই পানিতে নেমে পড়েন। এটা একদমই সুইসাইডাল। নদ-নদী, সাগর, হাওর-বাওড় কোনো সাধারণ বিষয় নয়। দূর থেকে স্বাভাবিক মনে হলেও সামান্য অসতর্কতায় কয়েক মিনিটের মধ্যেই মৃত্যু হতে পারে।
পানির গতি-প্রকৃতি না বোঝা:
অনেক সময় সাঁতার জানা থাকলেও মানুষ স্রোতের ফাঁদ, নিচের টান (সাকশন) বা ফ্ল্যাশ ফ্লাডের ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত থাকে না। সাঁতার জানলেও কোথায় নামা উচিত আর কথায় থামা উচিত, তাও অজানা। হয়তো আমাদের চোখের সামনে আমরা একটি ঝিরি, বহমান নদী বা শান্ত সাগর দেখে নেমে পড়ি, যা অনেক সময় বুঝতেই পারি না যে এর মধ্যে লুকিয়ে আছে মৃত্যুর ফাঁদ। পানির গতি-প্রকৃতি না বুঝে পানিতে নামার কারণে মৃত্যুর হার সবথেকে বেশি।
আবার অ্যাকটিভ সাঁতারের সময় শরীর প্রচুর কার্বন ডাইঅক্সাইড তৈরি করে। এই কার্বন ডাইঅক্সাইড রিলিজ করে অক্সিজেন নেয়াটা খুবই জরুরি। পানিতে এই অতি জরুরি বিষয়টি করতে না পারাও মৃত্যুর অন্যতম কারণ।

অসতর্কতা ও নিয়ম না মানা:
পানিতে মৃত্যুর অন্যতম আরেকটি বড় কারণ হলো নিয়ম না মানা। অনেক সময় আমরা সাঁতার না জেনেও লাইফ জ্যাকেট ছাড়া পানিতে নেমে যাই। আবার অচেনা জায়গায় লাফ দেই, যা সম্পূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ। অনেকে পাহাড়ে ট্রাভেলিং করতে গিয়ে অনেক সময় ঝিরির পাশে বা ঝর্ণার পাশে ক্যাম্প করেন। বর্ষায় এসব অঞ্চলে ক্যাম্প করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।
পানিতে প্রাণহানির ঝুঁকি কমানোর উপায়:
আমাদের দেশ মূলত নদীমাতৃক। প্রায় প্রতিটি জেলায়ই নদীসহ রয়েছে আরও অনেক ওয়াটার বডি। আমরা যদি পানির সঙ্গে বেঁচে থাকার সাধারণ বিষয়গুলো জেনে নেই, তাহলে ভ্রমণে অথবা এমনিতেও পানিতে মৃত্যু হার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব।
সাঁতার বিলাসিতা নয়, নদী মাত্রিক এই দেশে এটি একটি অপরিহার্য জীবনদক্ষতা। পরিবার, গ্রাম, মহল্লা, স্কুল, ক্লাব সবাই মিলে এই উদ্যোগ নেয়া যেতে পরে। এক্ষেত্রে সরকারেরও এগিয়ে আশা উচিত।
ট্রাভেলিং করার আগে নির্দিষ্ট এলাকার পানির প্রকৃতি সম্পর্কে জানা:
আমরা সাগর, নদী, ঝর্ণা বা হাওর- বাওড় যেখানেই যাই না কেন, পানির প্রকৃতি সম্পর্কে জ্ঞান থাকা অত্যন্ত জরুরি। ঝিরি, সাগর বা জলপ্রবাহ কখনোই সাধারণ পুকুর বা সুইমিংপুলের মতো নয়। এগুলোতে পানির গভীরতা ও স্রোতের গতি মুহূর্তেই বদলে যেতে পারে। স্রোতের নিচে ফাঁদ থাকে, থাকে ডিপ হোল বা সাকশন, যা অভিজ্ঞ সুইমারকেও বিপদে ফেলতে পারে।
আমাদের বোঝার চেষ্টা করতে হবে যে, কোথায় স্রোতের ফাঁদ বা ডিপ হোল (হোল পানির নিচে থাকা অতিরিক্ত গভীর জায়গা) বা সাকশন (যেখানে পানি ঘুরতে থাকে এবং মাঝখানে টেনে নেয়)। অনেকে এটিকে চোরা গর্ত, ঘূর্ণি ফাঁদও বলে থাকেন। যদি এমনটা আছে বা থাকতে পারে বলে মনে হয়, তাহলে এই জায়গাগুলো এড়িয়ে চলতে হবে।
স্রোতের ফাঁদ:
এটি এমন একটি বিষয়, যা অনেক সময় উপর থেকে দেখে বোঝার উপায় থাকে না। কিন্তু পানিতে তীব্র টান থাকে। শান্ত পানি ভেবে এই পানিতে নামলেই আপনি ভেসে যেতে পারেন গভীরে। আবার অনেক সময় ঘোলা পানিতে এগুলো বোঝার উপায় থাকে না, তাই অবশ্যই বৃষ্টির সময় বা ঘোলা পানিতে নামা একদমই উচিত নয়। একান্তই প্রয়োজন হলে সঙ্গে লাইভ জ্যাকেট, উইসেল, রোপ রাখা জরুরি। পানির গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে স্থানীয় অভিজ্ঞ লোক বা স্থানীয়দের থেকে জেনে নিন।

সাঁতারের সময় শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখার অনুশীলন:
আপনি যদি সাগরে, নদী-নালা বা যেকোনো ওয়াটার বডিতে সাঁতার কাটতে চান, তাহলে অবশ্যই বেসিক কিছু প্রশিক্ষণ নিয়ে নিতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে সাঁতারের সময় শ্বাস নেয়া ও ছাড়ার কৌশল। তাহলে আর যাইহোক, আপনি যেকোনো পরিস্থিতিতে দীর্ঘক্ষণ পানিতে ভেসে থাকতে পারবেন। সঙ্গে ভয় পেলেও যেন প্যানিক না হয় এমন মানসিক প্রস্তুতিও নিতে পারেন। সাঁতারের সময় তৈরি হাওয়া কার্বডাইঅক্সাইড ছেড়ে অক্সিজেন নিতে পাড়ার সাধারণ এই কৌশলও হতে পারে আপনার জীবন রক্ষাকারী একটি বিশেষ দক্ষতা। এটা নিশ্চিতভাবেই পানির পরিস্থিতিতে আপনাকে দীর্ঘক্ষণ টিকিয়ে রাখবে।
নিয়ম মানুন ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার:
বর্ষায় ট্রাভেলিংয়ে বিশেষ করে যদি এলাকাটিতে কোনো ওয়াটার বডি থাকে, তাহলে অবশ্যই আপনাকে লাইফ জ্যাকেট, হুইসেল ও রোপ নিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় লাফানো অবশ্যই পরিহার করতে হবে। ছবি তোলার ক্ষেত্রে অবশ্যই খেয়াল রাখবেন, যেন বেপরোয়া হয়ে না পড়েন।
প্রশিক্ষিত এবং অভিজ্ঞ লোকদের পরামর্শ:
স্থানীয় অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত গাইড, লাইফগার্ড অথবা ওপেন ওয়াটার সুইমারদের পরামর্শ নিতে পারেন। স্থানীয়রা অনেক কিছু জানেন, তাই তাদের পরামর্শ খুবই মূল্যবান।
শিশুদের জন্য করণীয়:
অবশ্যই কোনো অবস্থাতেই সঙ্গে থাকা শিশুকে একা ছাড়বেন না। পানিতে নামতে দেয়া পরিহার করুন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে বের হবেন। বর্ষায় যদি পাহাড়ে ট্র্যাকিং করার কথা ভাবেন, তাহলে অবশ্যই কিছু বিষয় মাথায় রাখতে হবে। বর্ষায় ট্র্যাকিং পরিহার করা উত্তম। একান্তই দরকার হলে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অবশ্যই মাথায় রাখা উচিত। খাল, ঝর্ণা বা নদীর পাশে ক্যাম্প করার আগে হাজার বার ভাবুন। অবশ্যই উচু ও নিরাপদ স্থানে বিশ্রাম নিন। স্থানীয়দের পরামর্শ নিন। গভীর ঝিরিতে হাঁটা এড়িয়ে চলুন। ঝর্ণার নিচে দীর্ঘ সময় অবস্থান করবেন না এবং ছবি তোলার ঝোঁক নিয়ন্ত্রণ করুন।
✪ আরও পড়ুন: চোখের খুশকি ও চুলকানি কী, এটি কেন ক্ষতিকর? চিকিৎসা জানালেন চক্ষু বিশেষজ্ঞ
এছাড়া মাথায় রাখতে হবে, পাহাড়ে আপনার পাশে বৃষ্টি না হলেও ঢল আসতে পারে। সুরক্ষিত গিয়ার (লাইফ জ্যাকেট, হুইসেল) সঙ্গে রাখুন। কখনোই একা ট্র্যাকিং করবেন না। দলবদ্ধ থাকার চেষ্টা করুন। হঠাৎ ফ্ল্যাশ ফ্লাড এলে অবশ্যই খালের ওপর দিয়ে দৌড়ে পালাবেন না। পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবেন না এবং মোবাইল ফোন বা ব্যাগ বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলবেন না।
পরামর্শ:
সাঁতার জানলেও বাঁচা যায় না, যদি পানির আচরণ না জানা থাকে। আবার সাঁতার না জানলেও পানিতে মৃত্যু থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা যায়। সাঁতার জানলেও আপনি বর্ষায় এবং যেকোনো রকম ঘোলা পানিতে সাঁতার পরিহার করুণ। সতর্ক থাকুন, নিয়ম মানুন, নিজে বাঁচুন এবং অন্যকেও বাঁচান।